নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬ | 2 বার পঠিত | প্রিন্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভূতপূর্ব নীতি শিথিলতার সুবিধায় গত বছরের শেষ প্রান্তিকে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর আগে সেপ্টেম্বর শেষে এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাপক ঋণ পুনঃতফসিলের পথ খুলে দেওয়ায় কেবল হিসাবের খাতায় এই পতন দেখা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছালেও ডিসেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণের অঙ্ক উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। তবে এই পরিসংখ্যানগত উন্নতি ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ দূর করতে পারেনি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা, যার বিপরীতে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল প্রভিশন ঘাটতি সাধারণ আমানতকারীদের জন্য বড় মাত্রার ঝুঁকি তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তায় বিপুল সংখ্যক গ্রাহক তাদের শ্রেণিকৃত ঋণ পুনঃতফসিলের আওতায় নিয়ে আসায় খেলাপি তালিকা থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ বেরিয়ে গেছে।
খেলাপি ঋণের এই চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে রাখা খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রাথমিকভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু পুনর্মূল্যায়নে দেখা যায়, আগের বছরগুলোতে প্রায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ কুঋণ গোপন রাখা হয়েছিল। এরপর ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিক থেকে এই অঙ্ক ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে—মার্চে ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি, জুনে ৬ লাখ ৮ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে তা সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে। বিদেশি অডিট ফার্মের নিরীক্ষা এবং বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রকৃত তথ্য প্রকাশের ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে।
খেলাপি ঋণের এমন নাটকীয় পতনের পেছনে কাজ করেছে গত সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা একটি বিশেষ পুনঃতফসিল নীতিমালা। ওই নীতির আওতায় মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ১০ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়, যার মধ্যে প্রথম দুই বছর কোনো কিস্তি পরিশোধ না করার সুবিধা (গ্রেস পিরিয়ড) রাখা হয়। পরবর্তীতে এই শর্ত আরও শিথিল করে ডাউন পেমেন্ট মাত্র ১ শতাংশে নামিয়ে আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, এই সুবিধা নিতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোম্পানি ও গ্রুপ আবেদন করেছে এবং ইতোমধ্যে ১ হাজার ৩০০ প্রতিষ্ঠান তাদের ঋণ নিয়মিত করেছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, এই নমনীয় নীতির কারণে অনেক ব্যাংক তাদের খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাৎে ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ সেপ্টেম্বরের ১ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকা থেকে কমে ডিসেম্বরে ১ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই পতন আরও প্রকট। এই খাতে তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে ৭৩ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা, যা এখন দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায়। তবে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট অনেকেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সতর্ক করে বলেন, পুনঃতফসিলকৃত এসব ঋণের অধিকাংশই আদায়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ। ফলে ২০২৭ সালের মধ্যে এই ঋণগুলো পুনরায় খেলাপি হওয়ার এবং ব্যাংক খাতে ফের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
Posted ৩:০০ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬
sharebazar24 | sbazaradmin
.
.